ডা. মোহিত কামাল
একটি জরিপে দেখা গেছে, ওথেলো সিনড্রম রোগে পুরুষেরা মহিলাদের তুলনায় বেশি ভুগে থাকে। মহিলা ও পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার আনুপাতিক হার (১:৩.৭৬)। গবেষণায় দেখা গেছে, প্যাথলজিক্যাল জেলাসি কয়েকটি প্রাথমিক রোগের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে। এ ধরনের রোগীদের ১৭-৪৪% এর প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া, ৩-১৬% এর ডিপরেসিভ ডিসঅর্ডার, ৩৮-৫৭% এর নিউরোসিস এবং পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার, ৫-৭% এর এলকোহলিজম, ৬-২০% এর ক্ষেত্রে অর্গানিক ডিজঅর্ডার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্যাথলজিক্যাল জেলাসির কারণে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। ব্রিটেনে ব্রডমুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণা রিপোর্টে ড. মোয়াট দেখিয়েছেন, এদের মধ্যে ১২% মহিলা এবং ১৫% পুরুষ প্যাথলজিক্যাল জেলাসিতে আক্রান্ত ছিল। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জেলাসি রোগী কর্তৃক শারীরিক জখমের মাত্রাও উল্লেখযোগ্য। এমনও দেখা গেছে ক্রমাগত তীব্র সন্দেহের জ্বালা সইতে না পরে অনেক নিরপরাধ পার্টনার আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
ওথেলো সিনড্রম রোগে কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে কৌশলে মূল্যায়ন করতে হবে। কতটুকু অমূলক বিশ্বাস রোগী ধারণ করে, কী পরিমাণ ক্রোধ বা রাগ রোগী বহন করছে ইত্যাদি। রোগীর ভেতর প্রতিশোধপরায়ণ মনোবৃত্তি থাকলে বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে।
রোগী তার সঙ্গীকে বিপর্যস্ত করে তোলে কি না তা যাচাই করে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে পার্টনারকে কৌশলে এবং ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করে না, সে রোগে আক্রান্ত। তাই সে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে চায় না। এক্ষেত্রে প্যাথলজিক্যাল বা ওথেলো সিনড্রম রোগের রোগীদের চিকিৎসা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ রোগী মনেই করে না, যে তার কোন রোগ রয়েছে। ফলে চিকিৎসার যে কোন উদ্যোগই তার কাছে অনধিকার চর্চা ও অন্যায় আচরণ বলে মনে হয়।
এক্ষেত্রে যদি স্ত্রী অর্থাৎ মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়েকে বুঝিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্বামীর প্রধান কাজ হবে স্ত্রীকে এ রোগ সম্পর্কে বোঝানো। বিফল হলে ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। যদি রোগটি প্রকৃতই অমূলক বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠে তবে এন্টিসাইকোটিক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। যাদের আত্মবিশ্বাস কম কিংবা ব্যক্তিত্বের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ডিলুশনাল ডিজঅর্ডার বা প্যাথলজিক্যাল জেলাসিটি ওভারভেল্যুড আইডিয়ার সাথে সম্পর্কিত কিনা তা যাচাই করে দেখতে হবে। ওথেলো সিনড্রোম রোগীরা নিজের সন্দেহের কথাগুলো অন্যের কাছে বলে পরামর্শ চায়। কিন্তু যাকে তিনি বলছেন, তার জন্য তিনি কতটুকু ইতিবাচক হবেন তা ভাবেন না। ফলে যিনি শুনছেন, তিনি তার কথা বিশ্বাস করে ভ্রান্ত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আর রোগীও সেই পরামর্শ গ্রহণ করে তার পার্টনারের সাথে নেতিবাচক আচরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে বন্ধু-বান্ধব, পরিবারসহ সবাইকে গঠনমূলক পরামর্শ দিতে হবে। কারণ একটি ভুল পরামর্শই ভেঙে দিতে পারে রোগীর সাজানো সংসার।
এই রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলো রোগীর সন্দেহের মাত্রাটা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, তা প্রমাণ করার জন্য রোগী বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত করে থাকে, এতে পার্টনারের তার নানা প্রকার সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে রোগীর পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। কোন অভিভাবক যদি বুঝতে পারেন, এটা এক ধরনের রোগ তবে এ ধরনের সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হয়। মূলত মামলাটা হয়েই থাকে ভুল বোঝাবুঝিকে কেন্দ্র করে। মা-বাবা বুঝতে পারেন না, তার সন্তান অসুস্থ। এক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বা ক্রিয়েশন অব এ্যাওয়ারনেস বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা যদি ১০০ জন লোকের কাছে এই রোগের তথ্য জানাতে পারে, এর মধ্যে ২ জন লোকও যদি সামাজিকভাবে সচেতন হয়, তাহলে কিছুটা হলেও এ সমস্যার সমাধান হবে।
মামলা হলে আইনজীবী যদি বুঝতে পারেন, রোগী অসুস্থ বা স্বামী যদি দাবি করে যে তার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ, তবে আইনজীবীর প্রথম কাজ হবে তার সত্যতা যাচাই করা। এক্ষেত্রে আদালতের উচিত হবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে তার সত্যতা যাচাই করে রিপোর্ট পেশ করা। এক্ষেত্রে স্বামী যেটা করতে পারেন সেটা হল, কেন তার স্ত্রী মানসিক রোগী; এর কারণগুলো আদালতে উপস্থাপন করা।
এক্ষেত্রে কারও যদি সন্তান থাকে, তার ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মা-বাবা অসুস্থ হলে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য যে মানসিক পরিবেশ দরকার হয়, এক্ষেত্রে তার অভাব দেখা দেয়। এতে শিশুটি মানসিকভাবে আঘাত পায়। যখন সন্তান অনবরত দেখতে থাকে, তার বাবা-মা’র মধ্যে দ্বন্দ্ব, ঝগড়া, এমনকি শারীরিকভাবে আঘাতের ঘটনাও ঘটছে তখন বাড়ন্ত শিশুটির মানসিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। পরিণতিতে সে ড্রাগ ও ক্রাইমে জড়িয়ে পড়তে পারে। অথবা নিজেই মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে । সন্তানের সুস্থ বিকাশের জন্য মননশীলতার জন্য, সামাজিক বন্ধন, মমতা, ভালবাসা জরুরী।
যদি উভয় পক্ষ থেকে এ সমস্যায় সমাধান না হয়, তাহলে দম্পতি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অর্থাৎ যদি তারা ভাবেন, ডিভোর্স হয়ে গেলে তারা সুখী হবেন। তবে এক্ষেত্রে সন্তানটিকে নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়; সন্তান কার কাছে থাকবে? সাধারণত এ ধরনের পরিস্থিতিতে সন্তান থাকে অরক্ষিত অবস্থায়। এক্ষেত্রে সন্তানের কাছেই জানতে হবে, সে কার কাছে থাকতে চায়, কার কাছে সে স্বস্তি বোধ করবে। যদি দেখা যায় সে তার মার কাছে থাকতে চায় কিন্তু মা রোগী প্রমাণিত হয় তবে তার কাছে রাখা নিরাপদ নয়। স্বামী যদি প্রমাণ করতে পারেন, তার স্ত্রী অসুস্থ, সেক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা হবে তাকে সুস্থ করা কিংবা সন্তানের অভিভাবকত্ব বাবাকে প্রদান করা। এক্ষেতে বাবা সুস্থ থাকলে বাবার কাছে রাখাই হবে নিরাপদ।
লেখক : বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসক-মনঃশিক্ষাবিদ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট