ওথেলো সিনড্রম কী?
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অকারন সন্দেহই “ ওথেলো সিনড্রম”
নামে পরিচিত। এই মানসিক সমস্যায় আক্রন্ত ব্যাক্তি ভ্রান্ত ধারনার
বর্শর্বতী হয়ে সন্দেহ করে যে তার জীবনসঙ্গীর অন্য নারী বা পুরুষের সাথে
শারিরিক সম্পর্ক রয়েছে।কিন্তু, এই ধারনার পক্ষে তাদের কাছে কোন যুক্তি বা
প্রমাণ থাকে না।অনেকে এটাকে মতিভ্রম বলেও মনে করেন। কিংহ্যাম এবং গরডনের
মতে, দাম্পত্যের বিশ্বাসভঙ্গজনিত সন্দেহের চূডান্ত রুপই হলো ওথেলো সিনড্রম।
এই সমস্যায় রোগীর অজ্ঞাতেই তার মানসিক পরিবর্তন হতে থাকে এবং সে তার
স্বামী/স্ত্রীর আচরনকে ভুল ভাবে ব্যাখা করতে শুরু করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে
এসে সে স্বামী/স্ত্রীর দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে বলে মনে করে।
“ ওথেলো সিনড্রম”- এর লক্ষ্মণসমূহ হল,
- হঠাৎ অবিশ্বাস করতে শুরু করা।
- অন্য নারী/পুরুষের দিকে তাকানোর বা মনোযোগ দেওয়ার অভিযোগ।
- অন্য নারী/পুরুষের সাথে চোখাচোখিকে ?নষ্টামীর?লক্ষ্মণ বলে ধরে নেওয়া।
- যথাযথ যত্ন না নেওয়ার অভিযোগ।
- নানা বিষয়ে জেরা করা।
- ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র ঘাটাঘাটি করা।
- প্রতিদিনের একই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা।
- অফিসের বিপরীতলিঙ্গের কলিগদের সম্পর্কে অযাচিত প্রশ্ন করা।
- ঘরে ফিরতে দেরী হলে প্রশ্নবানে জর্জরিত করা।
- নিয়মিত পোষাক-পরিচ্ছেদ চেক করা।
- সন্দেহ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক আছে বলে ধরে নেওয়া।
- নিয়মিত অনুসরন করা।
- আত্মবিশ্বাসের অভাব।
- নিজেকে বা জীবনসঙ্গীকে শারিরিক ও মানসিক ভাবে অত্যাচার করা।
“স্বাভাবিক” ঈর্ষাপরায়নতার সাথে “রুগ্ন” ঈর্ষাপরায়নতার পার্থক্য
- এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যাক্তি সবসময় একই চিন্তায় ব্যস্ত থাকে ফলে নিজের স্বাভাবিক কাজকর্মে মননিবেশ করেতে পারে না।
- জীবনসঙ্গীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, প্রায় সকল বিষয় যেমন- হাত খরচ, পোষাক পরিধান, বন্ধুবান্ধবদের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদিতে তাকে নিয়ন্ত্রন করতে চায়।
- কোন ভাবেই তারা তাদের ভ্রান্ত ধারনা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তারা তাদের জীবনসঙ্গীর সব কাজই অবিশ্বাসের লক্ষন দেখতে পায়।
- তারা স্বামী/স্ত্রীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
- তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দিতে থাকে।
- সবসময় দুঃশ্ছিন্তায় ভোগে।
- অকারনে রেগে যায় ও নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রন হারাতে থাকে।
- দিনে দিনে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
ওথেলো সিনড্রমঃ সত্যি ঘটনা
আমার বাবা প্রায় ৮ বছরের ও বেশী সময় ধরে ওথেল সিনড্রম বা ভ্রন্ত সন্দেহ
রোগে আক্রান্ত। প্রথম প্রথম আমরা বুঝতেই পারিনি যে কী হচ্ছে। এটা ছিল
অনেকটা সিনেমার মত। তিনি আমার মাকে সন্দেহ করতে শুরু করলেন, টাকা-পয়সা
নষ্ট করতে লাগলেন, বাথটাব, বিছানার চাদর, ঘরের দেয়ালে বীর্য দেখতে লাগলেন
এবং ক্যালেন্ডারে দিনগুল দাগ দিয়ে রাখতে লাগলেন।
বিভিন্ন জনকে টাকা দিতে লাগলেন আমার মায়ের সাথে বিভিন্ন পুরুষের, বিশেষ
করে বাবা যাদেরকে সন্দেহ করতেন, ছবি সংগ্রহের জন্য। তিনি তার ভ্রন্ত
ধারনাকে সত্য প্রমানের জন্য সাধ্যমত সবই করলেন। বাগানে পায়ের চিহ্ন, ভাঙা
ঘাস ইত্যাদি দেখে তার মনে হত মায়ের প্রেমিক প্রবররা মায়ের সাথে প্রেম
করতে এসেছিল। ভয়ংকর এবং বিভৎস।
তাকে জোর করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়াছিল এবং সেখেনে তাকে
সাপ্তাহে একটা করে ইনজেকশন দেওয়া হল। কিন্তু ঔষধটি তাকে অনেকটা যান্ত্রিক
করে ফেলল। আমনকি তিনি তার স্বভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললেন। এটা খুবই
হতাশার এবং কষ্টের ছিল। এই সমস্যায় আক্রন্ত ব্যাক্তি নিজের ভ্রান্তিকে
বুঝতে পারেনা ফলে এর থেকে বেরিয়ে আসার ও চেষ্টা করে না। এর কোনও যৌক্তিকতা
আছে কিনা তা ও ভেবে দেখেনা। এই সমস্যা নিই তাদের সাথে আলোচনা করাও বৃথা।
এটা শুধুই তাদের ভ্রন্ত ধরনাকেই বাড়তে সাহায্য করে এবং তারা ধীরে ধীরে
বৃত্তবন্দী হয়ে পড়ে। আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয় এটা অনেকটা অর্টিজম বা
ডেমেনশিয়ার মত যা তাকে মানসিক রগী করে তোলে। হিংসা মানুষের স্বভাবিক ধর্ম
যা তাকে তার নিজের অধিকার রক্ষায় উৎসাহী করে। কিন্তু এই ধর্মকে সে যখন অতি
মাত্রায় চর্চা করতে শুরু করে, সে অন্যের সামাজিক অধিকার হরন করতে শুরু
করে এবং ধীরে ধীরে সন্দেহ প্রবন হয়ে ওঠে।
বৃত্তে বন্দী থেকে থেকে তারা তাদেরকে আরও মানসিক ভাবে অসুস্থ করে তোলে।
রোগের লক্ষণগুলোকে লুকাতে গিয়ে তারা বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এমন পরিস্থির
সৃষ্টি করতে চায় যা দিয়ে নিজেকে সত্য বলে প্রমান করতে পারে। এই রোগে
আক্রান্ত ব্যাক্তকে এমন কোথাও নিয়ে যাওয়া দরকার যেখানে সে পরিপূর্ন
বিশ্রাম নিতে পারবে, আনন্দে সময় কাটাতে পারবে, বই পড়তে পারবে। তবে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হল তাকে তার বৃত্তে থেকে বের করার চেষ্টা না করা।
ডাক্তার বা ঔষধের চেয়ে পরিবারের সাহায্য তার সবচেয়ে বেশী দরকার। তার মানে
এই নয় যে ঔষধের প্রয়োজণীয়তা নেই। শুরুতে আমার বাবা কে ও ঔষধ দেওয়া
হয়েছিল যেগুলো পরে দুই বার পরিবরর্তন করা হয়। তিনি তার প্রত্যহিক খাবার
পরিবরর্তনের পাশাপাশি ক্রিলের তেল ও ভিটামিন বি১২ খেয়েছিলেন। মদ ও ভাজা
পোড়া খাবার না খাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা অত্যাত্ন জরুরী।
দুশ্চিন্তা সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তোলে। আমার বাবা খুবই সৌভাগ্যবান যে তিনি
সর্বোচ্চ পারিবারিক সমর্থন পেয়েছেন, আমার মা খুবই শক্ত মহিলা এবং তিনি
ভাল করেই জানেন কি ঘটতে চলেছে। যে সমস্ত মহিলারা এই ধরনের ভয়ংকর এবং বিভৎস
পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তাদের জন্য রইল আমার হৃদেয়র সমস্ত
ভালবাসা।
রোগ পর্যালোচনা
ওথেলো সিনড্রম-এর ক্ষেত্রে রোগ পর্যালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি রোগ
প্রতিকারের প্রথম পদক্ষেপ। এটি একটি ব্যাপক প্রক্রিয়া যাতে সব ধরনের
খুটিনাটির প্রতি লক্ষ্য রাখতে হয়। প্রথমেই, রোগের ইতিহাস সম্পর্কে বিশদ
ভাবে জানতে হবে। স্বামী-স্ত্রীকে একসাথে ও আলাদা আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ
করতে হবে। বিষয়টিকে বিচক্ষণতার সাথে পরিচালনা করতে হবে কারন আক্রান্ত
ব্যাক্তি কখনই নিজের ভূল স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে না। স্বামী-স্ত্রীর
মধ্যকার সম্পর্ক, তাদের যৌন জীবন, পরস্পরের প্রতি আচরন, তাদের সম্পর্কের
মাঝে পরিবারের অন্যদের ভূমিকা ইত্যাদি সম্পর্কেও র্পযাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করতে
হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রোগের তীব্রতা ও রোগীর মানসিক অবস্থা নির্ণয়
করতে হবে। অন্যান্য পারিপাশ্বিক বিষয় যেমন, অন্য কোন মানসিক সমস্যা, মাদক
বা অন্য কোন উত্তেজক ঔষুধের ব্যাবহার, ঝুঁকির মাত্রা যেমন, রোগীর
আত্মহত্যার প্রবনতা, জীবনসঙ্গী বা পরিবারের অন্যদেরকে শারিরিক বা মানসিক
ভাবে নির্যাতন ইত্যাদি ও বিবেচনা করতে হবে।
চিকিৎসা
এই ধরনের রোগীকে শারিরিক, মানসিক ও সামাজিক সব উপায়েই চিকিৎসা করা প্রয়োজন।
শারীরিকঃ
- মানসিক রোগের প্রাথমি্ক চিকিৎসা
- মানসিক রোগের ঔষধ সেবন
- বিষাদগ্রস্থতা থেকে মুক্তির জন্য ঔষধ সেবন
মানসিকঃ
- আক্রান্ত ব্যাক্তি ও তার জীবনসঙ্গীর জন্য কাউন্সেলিং
- আচরনগত চিকিৎসা
- মন-বিশ্লেষনের মাধ্যমে চিকিৎসা
- দৃষ্টভঙ্গী পরির্বতনের জন্য মানসিক চিকিৎসা
- পরিবারের সমর্থন
- জীবনসঙ্গীর সহচার্য
সামাজিকঃ
- স্বামী-স্ত্রীকে কিছুদিনের জন্য আলাদা বসবাস করতে দেওয়া
- শিশুদের জন্য উন্নয়নমূলক সামাজিক কাজে আংশগ্রহন বৃদ্ধি
- মাদকাসক্ত হলে, মাদক নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা দেওয়া
No comments:
Post a Comment